বাংলাদেশ   শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

ইজরাইল-আমেরিকার পরাজয়ে সাহসী ইরানের বিজয় হবে! 

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ০৮:২২ পিএম, ২০২৬-০৪-০৬

ইজরাইল-আমেরিকার পরাজয়ে সাহসী ইরানের বিজয় হবে! 

মাহাবুব রহমান দুর্জয় 

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব রাজনীতির
অস্থিরতার কেন্দ্র। সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলেও এই সংঘাত আবারও দেখিয়েছে যে যুদ্ধের ফলাফল কেবল সামরিক প্রযুক্তি বা অস্ত্রশক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং কৌশল, রাজনৈতিক সমর্থন, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে বহু দশকের ইতিহাস, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের শিকড় মূলত ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময় থেকে শুরু। তার আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ শাসন ক্ষমতায় ছিল। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সমর্থনে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা ইরানের রাজনৈতিক স্মৃতিতে গভীর ক্ষোভ তৈরি করে। এরপর ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ সরকারের পতন ঘটে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে। সেই সময় থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় সম্পূর্ণ বৈরিতায় পরিণত হয় (Britannica, Iranian Revolution).

পরবর্তী কয়েক দশকে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে, যদিও ইরান তা অস্বীকার করে। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমায়। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে গেলে সম্পর্ক আবারও অবনতির দিকে যায় এবং নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে (International Atomic Energy Agency Reports; Council on Foreign Relations).

সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই ধরনের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং তার পারমাণবিক কার্যক্রম থামানো। হামলার ফলে ইরানের বেশ কিছু সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ হতাহত হয়। একই সময় ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে (Center for Strategic and International Studies; BBC Security Analysis).

এই সংঘাতে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত গুরুতর। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী সংঘাতের প্রথম ধাপেই বহু বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আহত হয়েছে। সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা এবং পরিবহন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। এই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয় (International Energy Agency; U.S. Energy Information Administration).

সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা ব্যবহার করেছে। তারা বিমান হামলা, সাইবার অপারেশন এবং নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের মূল লক্ষ্য যদি হয় প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা বা রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে দেওয়া, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জন করা অনেক বেশি কঠিন। অনেক বিশ্লেষকের মতে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইলের বড় সমস্যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের অভাব। সামরিকভাবে বড় ক্ষতি করা সম্ভব হলেও ইরানের রাষ্ট্র কাঠামো টিকে গেছে এবং সরকার কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে (CSIS Strategic Assessment; RAND Corporation Studies).

এই বাস্তবতায় কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে ইরান একটি কৌশলগত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সামরিকভাবে দুর্বল হলেও ইরান আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে ব্যবহার করে যুদ্ধের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রভাব এবং ভূগোলগত অবস্থান তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। এছাড়া জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার করার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে অনেক বিশ্লেষক এটিকে সরাসরি সামরিক বিজয় না বলে একটি “কৌশলগত স্থিতিশীলতা” বা প্রতিরোধের সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন (Middle East Institute Analysis; Al Jazeera Strategic Reports).

এই সংঘাত ইউরোপের জন্যও বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর আংশিকভাবে নির্ভরশীল। ফলে অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে ইউরোপীয় অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য শরণার্থী সংকট ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, কারণ তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আবার অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী (European Council on Foreign Relations; International Energy Agency).

আন্তর্জাতিক রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কূটনৈতিক সমর্থন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেক দেশ সরাসরি সামরিক অভিযানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিতে দ্বিধা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হলে কোনো বড় শক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের ঐক্য আগের তুলনায় কম দৃঢ় বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন (Council on Foreign Relations; Brookings Institution).

সব মিলিয়ে এই সংঘাত দেখিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল শুধু অস্ত্রের শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক কৌশল, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল তাদের সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। অন্যদিকে ইরান বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও রাষ্ট্র কাঠামো বজায় রেখে এবং আঞ্চলিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ তাই এখনও অনিশ্চিত, এবং এই অঞ্চলের প্রতিটি সংঘাত বিশ্ব রাজনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্যসূত্র :
Britannica - Iranian Revolution; Iran-U.S. Relations
International Atomic Energy Agency Reports on Iran Nuclear Program
Council on Foreign Relations - Backgrounder on Iran Nuclear Deal
Center for Strategic and International Studies (CSIS) - Middle East Security Analysis
RAND Corporation - U.S. Strategy in the Middle East
International Energy Agency - Global Oil Supply Reports
U.S. Energy Information Administration - Strait of Hormuz Analysis
European Council on Foreign Relations - Europe and Middle East Security
Middle East Institute - Iran Strategic Assessment
Brookings Institution - U.S. Foreign Policy Analysis
BBC News Security & Middle East Analysis
লেখক : মানবাধিকার সংগঠক ও কলামিস্ট। 

রিটেলেড নিউজ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত


সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত


বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত


বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত


মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত


চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর